Friday, April 10, 2020

মুসলিম বোঝাপড়ায় চিকিৎসাবিদ্যা  

ইফতেখার জামিল 

সুস্থতা ও স্বাস্থ্য প্রত্যেক সভ্যতার প্রধান প্রশ্নগুলোর একটি। বস্তুত সুস্থতা ও স্বাস্থ্য ঠিক থাকলেই মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকার ব্যবস্থাপনা সম্ভব। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আত্মরক্ষার প্রবণতা অনেক বেশী শক্তিশালী। মানুষ যা কিছু করে, তার অধিকাংশই তার শারীরিক ও আত্মিক মুক্তির জন্যই করে থাকে। যার সাথে সুস্থতা ও স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ সরাসরি সংশ্লিষ্ট। তাই প্রত্যেক ধর্ম, দর্শন ও সভ্যতায় চিকিৎসাকে অত্যন্ত গুরুত্বের চোখে দেখা হয়ে থাকে। 

দুই হাজার বিশ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রেক্ষিতে সুস্থতা ও স্বাস্থ্যের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। এই প্রশ্নের সাথে অনেক কিছু জড়িত। আপনি কীভাবে সুস্থতা ও স্বাস্থ্যের বিষয়কে বিবেচনা করেন, এর সাথে আপনি কীভাবে রোগ, আরোগ্য ও প্রতিরোধকে চিহ্নিত করবেন, সেটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পাশাপাশি মহামারী থেকে মুক্তির ক্ষেত্রেও চিকিৎসা বোঝাপড়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহামারী যেমন মানুষের নৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেয়, তার পাশাপাশি নৈতিকতা কীভাবে বৈষয়িকভাবে বিপর্যয় মোকাবেলা করে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। 

‘শরীরের হক’  : সুস্থতা ও চিকিৎসায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি  

নবীজি বলেছেন, শক্তিশালী মু’মিন দুর্বল মু’মিনের চাইতে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় ( মুসলিম ও ইবনে মাজা ) এই হাদিসের প্রেক্ষিতে সুস্থতার গুরুত্ব বুঝা যায়। কেননা সুস্থতা ছাড়া শক্তিশালী হওয়া সম্ভব নয়।

পাশাপাশি আরেক হাদিসে নবীজি বলেন, দু’টি নেয়ামতের বিষয়ে মানুষ অনেক উদাসীন থাকে : সুস্থতা ও অবসরতা ( বুখারী ) বস্তুত সুস্থতা ছাড়া আল্লাহর ইবাদত-আনুগত্য করা সম্ভব নয়। সে প্রেক্ষিতে সুস্থতার ক্ষেত্রে উদাসীনতাকে তিরস্কার করা হয়েছে। স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।  

এর মূলভিত্তি হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের শরীর আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামত, শরীরের মালিকানা আল্লাহর। এ কারণেই কেউ মৃত্যুবরণ করলে বলা হয়, ইন্না লিল্লাহি ও ইন্না ইলাহি রাজিউন অর্থাৎ আমরা আল্লাহর, আল্লাহর কাছেই আমরা ফিরে যাবো। তাই শরীরের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা মানুষের কাঁধে আল্লাহর আমানত। এক হাদিসে নবীজি বলেন, তোমার কাঁধে তোমার শরীরের দায়িত্ব রয়েছে ( আবু দাউদ ) মোটকথা সুস্থতা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কেবল অধিকার বা ইচ্ছা নয়, এটি ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। 

সে প্রেক্ষিতে ইসলাম রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাকেও বিশেষ গুরুত্বের চোখে দেখে থাকে। নবীজি বলেন, তোমরা চিকিৎসাগ্রহণ করো, কেননা একমাত্র বার্ধক্য ছাড়া প্রত্যেক রোগের ওষুধ ছে ( আবু দাউদ ) এই হাদিসে রোগ ও অসুস্থতাকে বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে থাকে, সেটা সাধারণত নির্দিষ্ট কারণেই ঘটে থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় ও ক্ষমতায় এভাবেই কার্যকারণ সম্পর্কের মাধ্যমে পৃথিবী পরিচালিত হয়। 

এই কার্যকারণ সম্পর্ককেই ইসলামের দৃষ্টিতে, সুন্নাতুল্লাহ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।  আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, আপনি আল্লাহর সুন্নত ও নিয়মে কোন পার্থক্য পাবেন না ( সূরা ফাতির, ৪৩ )। হামিদুদ্দীন ফারাহী বলেন, সুন্নত শব্দটি যখন আল্লাহর দিকে সমন্ধিত হয় তখন আল্লাহর কাজের মধ্যে যে রীতি নির্ধারিত আছে, তাকেই সুন্নাতুল্লাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আরেকস্থানে তিনি বলেন, সুন্নাতুল্লাহ অর্থ বান্দাদের মধ্যে আল্লাহর নির্ধারিত কর্মপন্থা। ( আল মুফরাদাত ) 

তবে ইসলামিক বৈষয়িকতার সাথে বস্তুবাদী কার্যকারণ ও বৈষয়িকতার কিছু পার্থক্য আছে। ইসলামের দৃষ্টিতে বৈষয়িকতা স্বাধীন ও স্বয়ম্ভু নয়, বরং তার সাথে আল্লাহর ইচ্ছার সমন্ধ আছে। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া এই কার্যকারণ সম্পর্ক কার্যকর হতে পারে না। আল্লাহ চাইলে একে আটকেও দিতে পারেন, যেমন আমরা মুজিযা ও কারামাতের ক্ষেত্রে দেখি থাকি। নবীজি বলেন, সবাই যদি তোমাকে উপকার করতে চায়, তবুও আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তারা উপকার করতে পারবে না, সবাই যদি তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবুও আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ক্ষতি করতে পারবে না। ( তিরমিযী)  

যেহেতু বৈষয়িকতার মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছা কার্যকর থাকে, তাই তার কাছে দোয়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈষয়িকতার নৈতিক শিক্ষাগ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ হলে আপনি অবশ্যই ওষুধগ্রহণ করবেন, তবে তার থেকে আপনি আপনার নৈতিক ত্রুটি ও স্খলনের বিষয়েও শিক্ষা গ্রহণ করবেন। নবীজির এসব নির্দেশনা থেকে ইসলামে সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার বিশেষ গুরুত্ব বুঝে আসে।              

‘ফরজে কেফায়াহ’  : সমাজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ধর্মীয় দায়িত্ব 

ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে যেসব বই সবচেয়ে বেশী আলোচিত ও বহুল পঠিত, তার মধ্যে তা’লীমুল মুতাআল্লিম অন্যতম। ইমাম বুরহান উদ্দিন যারনূজী জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব, তার ধারা ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। পুস্তকের শুরুতেই তিনি জ্ঞানের প্রতিগুরুত্বায়ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। অর্থাৎ কোন জ্ঞানঅর্জন কেন গুরুত্বপূর্ণ, আগে কোন জ্ঞানঅর্জন করতে হবে এবং সর্বোপরি সামাজিকভাবে কে জ্ঞানঅর্জনের দায়গ্রহণ করবেন, সেসব প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা করেছেন। 

ইমাম যারনূজীর ব্যাখ্যায় যেসব বিষয় প্রতিমুহূর্তে প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয়– যেমন, মৌলিক ইবাদত-আমল ও নৈতিকতা-আখলাক, সেসব বিষয়ের জ্ঞানঅর্জন প্রত্যেকের ওপর আলাদা আলাদাভাবে ফরজ বা ফরজে আইন। কেননা এছাড়া যথাযথভাবে বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়। ইসলামী জীবন নির্বাহ করাও অসম্ভব। অন্যদিকে যেসব বিষয় মাঝেমাঝে প্রয়োজনীয়, যেমন বিস্তারিত আকিদা ও ফিকাহ, সেগুলো প্রত্যেক অঞ্চলের জনসংখ্যা ও আয়তন অনুপাতে কিছু মানুষের জন্য অর্জন করা ফরজ বা ফরজে কেফায়াহ। 

কেফায়াহ অর্থ যথেষ্ট অর্থাৎ যেসব বিষয় সবার জন্য আলাদা আলাদাভাবে আবশ্যক নয়, প্রয়োজন পূর্ণ হলেই যথেষ্ট, সেসব বিষয়কেই ফরজে কেফায়া বলা হয়। 

এক্ষেত্রে প্রয়োজন পূর্ণ না হলে সবাই গুনাহগার হবেন। শাসক এর জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন। ইমাম যারনূজীর ব্যাখ্যায় বুঝে আসে, চিকিৎসাবিদ্যা ফরজে কেফায়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা চিকিৎসা সমাজের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য বিষয়। যদি কোন সমাজে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট পরিমাণ চিকিৎসক ও চিকিৎসা সামগ্রী না থাকে, তাহলে ঐ সমাজের সবাই গুনাহগার হবে। শাসক এর জন্য দায়বদ্ধ হবেন।  

ইমাম শাফেয়ী রাহঃ বলেন, জ্ঞান তো দুই প্রকার। ধর্মীয় বিষয়ে ফিকাহবিদ্যা আর শরীর বিষয়ে চিকিৎসাবিদ্যা। বস্তুত সমাজের সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। এর জন্য মুসলিম সমাজের নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে দায়বদ্ধ থাকবেন। প্রাথমিকভাবে শাসকবৃন্দ দায়বদ্ধ থাকবেন, তাদের দায়িত্বহীনতার পরিস্থিতিতে উলুল আমরের দ্বিতীয় প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে আলেম সমাজের এই দায়িত্বগ্রহণ করতে হবে। বস্তুত শরীরের হক সংরক্ষণ ও শক্তিশালী মুসলিম জনগোষ্ঠী তৈরিতে চিকিৎসাবিদ্যার কোন বিকল্প নেই। 

চিকিৎসার কেন্দ্র : মুসলিম ইতিহাসে চিকিৎসাবিদ্যার ধারা 

মুসলিম সভ্যতা বিকাশের আগে আরব অঞ্চলে চিকিৎসাবিদ্যা খুবই আদিম ও প্রাথমিক স্তরে সীমিত ছিল। ইবনে খালদুনের এ বিষয়ে বিশেষ অবলোকন রয়েছে। আরবরা প্রধানত বেদুঈন জাতি ছিল। ছোট ছোট জনবসতি গড়ে উঠলে নগর-নাগরিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়নি। ইবনে খালদুন লেখেন, যে কোন সমাজের যাযাবর-বেদুঈনদের বিশেষ চিকিৎসা প্রকৌশল থাকে, যা তারা সাধারণত তাদের পূর্বপুরুষ সর্দার-মুরুব্বীদের সীমিত অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করে থাকে। এর কিছু হয়তো ঠিক হয়। তবে তার ভিত্তি কোন প্রাকৃতিক সূত্র বা অভিজ্ঞতা নির্ভর হয় না। আরবদেরও এমন অনেক চিকিৎসা-কৌশল ছিল। ( মুকাদ্দিমায়ে ইবনে খালদুন, পৃ. ৬৫১)

তবে আমরা আগেই যেমন বলেছি, ইসলাম চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত অপবিশ্বাস-কুসংস্কার দমনেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। জাহেলি যুগে, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি অলৌকিক বিষয়কে রোগ-আরোগ্যের প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হত, যেমনটা কোন পশ্চাদপদ সমাজের বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি জাদুকর-তান্ত্রিক-ধর্মীয় নেতাদের চিকিৎসক হিসেবে বিবেচনা করা হত। ইসলাম জাহেলিয়াতের এসব কুসংস্কার ভেঙ্গে দিয়ে সুন্নাতুল্লাহ বা কার্যকারণ ধারণা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।  

ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবে মুসলিম সভ্যতায় খুব দ্রুত চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশ ঘটে। বরং গ্রীক-রোমান যুগের পর দীর্ঘদিন ইসলামী সভ্যতাই চিকিৎসাবিদ্যার সিলসিলা এগিয়ে নিয়ে যায়। মুসলিম বিজ্ঞানীদের টেক্সট বুকগুলোই দেশে দেশে পঠিত হতে থাকে। চিকিৎসা বিষয়ক উচ্চশিক্ষার জন্য আগ্রহীরা ইস্পাহান, বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও কর্ডোভায় পাড়ি জমাতে থাকে। এটি এত স্বীকৃত বিষয় যে এতে নতুন তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন নেই।  

মুসলিম চিকিৎসকদের জীবনী ও চিন্তা নিয়ে বেশ কিছু উপন্যাসও আছে। এর মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে, মার্কিন উপন্যাসিক Noah Gordon এর The Physician। একাদশ শতাব্দীতে লন্ডনের এক যুবক ইউরোপ হয়ে পারস্যের ইস্পাহানে ইবনে সীনার মাদরাসার পথে রওনা হয়। পরবর্তীতে ইবনে সীনার হাসপাতালে যোগদান করে। মাদরাসার তাত্ত্বিক বেশকিছু আলোচনাও এসেছে কাহিনীতে। এই যুবকের ঐতিহাসিক কালযাত্রার রূপকেই মুসলিম সভ্যতার চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি ফুটে উঠে। 

‘ইনহিতাত’ : মুসলিম সভ্যতায় বিপর্যয় ও তার প্রতিক্রিয়া 

চিকিৎসাবিদ্যায় মুসলমানদের এই অগ্রগতি ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা ইংরেজি পনের-ষোল শো শতক পর্যন্ত বজায় ছিল। তবে জ্ঞানবিজ্ঞানের সাথে রয়েছে রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশেষ সম্পর্ক। মুসলিম সভ্যতার দীর্ঘ সময়ে একেক কালপর্বে একেক অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে, এই উত্থান-পতনকে কেন্দ্র করেই মুসলিম ইতিহাসে চিকিৎসা বিদ্যার ক্রমবিকাশ পরিচালিত হয়েছে। কেন্দ্র স্থানান্তরিত হলেও মূল নিয়ন্ত্রণ ঠিকই বজায় ছিল। তবে সর্বশেষ উসমানী সাম্রাজ্যে অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে, খেলাফতের নেতৃত্বের পাশাপাশি চূড়ান্তভাবে হাতছাড়া হয়ে যায় চিকিৎসাবিদ্যায় মুসলিম নেতৃত্ব। 

খালদুনের বয়ানে এই কেন্দ্রচ্যুতির ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। খালদুন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সভ্যতার ধারাবাহিকতা ও ক্রমবিকাশের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি বলেন,

যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে, তাহলে মানুষ তার পানাহার-বাসস্থানের প্রয়োজন পূর্ণ করা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তার এই প্রয়োজন পূর্ণ হলেই সে জ্ঞান-বিজ্ঞান-শাস্ত্রের মতো অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে মনোনিবেশ করতে পারে। মানুষ তার চিন্তা-বিবেচনার মাধ্যমে পশুদের থেকে পৃথক ও বিশিষ্টপূর্ণ হয়। পানাহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা না হলে সে তার মানবিক গুণাবলী বিকাশ করতে পারে না, জৈবিক ও মানবীয় প্রয়োজনেই অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে বাধ্য হয়। (আল মুকাদ্দিমা, পৃ. ৪৪১) 

মুসলিম সভ্যতার পতনের সাথেসাথে উনিশ ও বিশ শতকে মুসলিম দেশগুলোতে সর্বব্যাপী পশ্চিমা উপনিবেশের বিস্তার ঘটে, এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি মুসলিম সমাজে ব্যাপক মূর্খতার বিস্তার ঘটে। নবীজি জাহেলি যুগে যেসব চর্চা ও বিশ্বাস নিষিদ্ধ করেছেন, সেসব আবার ফিরে আসতে থাকে। গ্রহ-নক্ষত্রের মতো অলৌকিক বিষয়কে রোগ-আরোগ্যের প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। পাশাপাশি জাদুকর, তান্ত্রিক, বেশরা পীরদের চিকিৎসক হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। চিকিৎসায় দোয়া-পানি পড়ার মতো বিষয় মুসলিম সভ্যতায় প্রচলিত থাকলেও জাদু-টোনা-তন্ত্র-মন্ত্রের কোন অনুমতি নেই। বাংলাদেশে এখনো এসবের প্রভাব বিদ্যমান।

উপনিবেশ ও উপনিবেশ পরবর্তী স্বাধীনতা অর্জনের কালপর্বে পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যা সরকারি অর্থায়নে মুসলিম দেশগুলোতে প্রচলিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃত হয়। এর প্রেক্ষিতে দু’টি বড় ক্ষতি হয়। চিকিৎসাবিদ্যা ও শাস্ত্র পশ্চিমাপ্রবণ হয়ে উঠে ; চিকিৎসা হয়ে উঠে নিছক বস্তুবাদী বৈষয়িক বিষয়, পাশাপাশি স্থানীয় ও মুসলিম চিকিৎসাকে এককাট্টাভাবে কুসংস্কার হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সাথে বিচ্ছেদ ঘটে যায় মুসলমানদের। চিকিৎসাবিদ্যাও হয়ে উঠে উপনিবেশ ও পশ্চিমাকরণের বিশেষ মাধ্যম।  

‘চিকিৎসক’ : নতুন সামাজিক শ্রেণী 

লেবানন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য গবেষক সালিম আদিব দেখান, পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যা অনেক ক্ষেত্রে উপনিবেশের বৈধতা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। উপনিবেশ বিজ্ঞানের যুক্তিতে ‘পশ্চাদপদ’ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ‘কুসংস্কার’ থেকে মুক্তির জন্য মুসলিম দেশগুলো দখল করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়। ‘পাপী’ মুসলিম জনগোষ্ঠীর salvation বা গুনাহ থেকে মুক্তি হিসেবে চিকিৎসাবিদ্যাকে খৃস্টান মিশনারীরা ধর্মান্তরের ক্ষেত্রেও টুল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

পাশাপাশি পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যা প্রধানত পশ্চিমা ব্যবসায়ী কোম্পানি ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিণত হয় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য বিশাল ভোক্তাগোষ্ঠী, নতুন ওষুধ এক্সপেরিমেন্টের বিশেষ সুযোগ। স্বাধীনতা অর্জনের পরেও এই অর্থনৈতিক সিলসিলা এখনো জারি আছে। সালিম আদিবের ব্যাখ্যায় উপনিবেশ বজায় রাখতে অর্থনৈতিক চক্র অনেক ক্ষেত্রে সৈনিকের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে। 

এখন চিকিৎসা মানেই পুঁজিবাদ। চিকিৎসা শুধু ধনিক শ্রেণীর অধিকার ; এভাবে পশ্চিমা প্রভাবে মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে ধনিক শ্রেণীর ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এভাবে আধুনিক পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যা এক ধরণের বিশেষ সামাজিক শ্রেণী তৈরিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। এর প্রতিক্রিয়ায় অনেক দেশে বিপ্লবীরা চিকিৎসক শ্রেণীকে শ্রেণী-শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। যেমন কম্বোডিয়ায় বিপ্লবীরা পশ্চিমা চিকিৎসকদের ক্লিনিক থেকে বের করে হত্যা করে। তাদেরকে জনগণের শত্রু হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।   ( From the biomedical model to the Islamic alternative: A brief overview of medical practices in the contemporary Arab world )   

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, এই বিপর্যয়ের জন্য খোদ চিকিৎসকরা দায়ী নন, দায়ী আমাদের বর্তমান পশ্চিমা চিকিৎসা শিক্ষার ধারা, প্রকৃতি ও প্রবণতা। চিকিৎসকদের মধ্যে ধার্মিকদের সংখ্যা কম নয়। বরং আনুপাতিকভাবে বরং অন্যান্য পেশা থেকে এখানে ধার্মিকদের সংখ্যা সম্ভবত বেশী। তবে পাশ্চাত্যের ইসলামী তাত্ত্বিক জনাথন ব্রাউন দেখান, চিকিৎসকদের এই নতুন সামাজিক শ্রেণী-পরিচয় মুসলিম সমাজে নতুন ধরণের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তৈরিতে সাহায্য করেছে। যাতে ট্রাডিশনাল আলেমদের রাজনৈতিকভাবে দুর্নীতিবাজ ও জ্ঞানগতভাবে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে চিকিৎসকদের মধ্যে নিজেদেরকে ধর্মীয় ব্যাখ্যাকার হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। ( Is Islam Easy to Understand or Not?: Salafis, the Democratization of Interpretation and the Need for the Ulema ) 

শুধু এখানেই সীমিত নয়, প্রখ্যাত গবেষক আহমদ সালেম দেখান, সমকালীন যুগে অধিকাংশ মুসলিম দলের প্রধান নেতৃত্ব চিকিৎসক ও ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, আরব বসন্তের আগে মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের শতকরা পঁচাশি ভাগ সদস্য বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন। অন্যান্য দলগুলোর মধ্যেও এই ধারার পরিসংখ্যান পাওয়া যায় বলে তথ্য-সূত্র পেশ করেছেন আহমদ সালিম। এর ব্যাখ্যায় তিনি সামাজিক শ্রেণী পরিচয়কে নেতৃত্ব লাভের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে দেখিয়েছেন। ( আস সুবুলুল মারদিয়াহ ) 

তিউনিসিয়ার ইসলামপন্থী দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল ফাত্তাহ মুরু এ পরিস্থিতির জন্য আফসোসও করেছেন। তার মতে মানবিক শাখার জানাশোনা ছাড়া বোঝাপড়ায় সীমাবদ্ধতা থেকে যায়, এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। (https://www.youtube.com/watch?v=EAqfp8WhK-0,العلوم الانسانية هي من يغير واقع الأمة) পাশাপাশি মুসলিম চিন্তাবিদ হিবা আব্দুর রউফও ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক কল্পনা বইয়ে এই সঙ্কট বিষয়ে মন্তব্য করেন, ধর্মীয় বিশেষজ্ঞতার কোন বিকল্প নেই। কেন সিরিয়া বিপ্লব বিপদে পড়েছে, তার ব্যাখ্যাতেও ডক্টর আহমদ তু’মা মানবিক ও ধর্মীয় চিন্তায় বিশেষজ্ঞতাহীন নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন। (https://www.youtube.com/watch?v=sMDKasfRhn4, هل الثورة السورية في خطر؟ )

শেষকথা : ‘সুন্নাতাল্লাহিল্লাযীনা খালাও মিন কাবলিকুম’  

ইতিপূর্বে আমরা চিকিৎসাবিদ্যায় মৌলিকভাবে ইসলাম কী বলে, তার অবস্থান ও গুরুত্ব কতটুকু, মুসলিম সভ্যতায় কীভাবে চিকিৎসাবিদ্যা চর্চিত হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছি। পাশাপাশি সমকালীন বিপর্যয়ের বর্ণনাও দিয়েছি। বস্তুত এসব কিছুই সভ্যতাগত কার্যকারণের সাথে সম্পর্কিত। সুন্নাতুল্লাহ শিরোনামে আমরা আগেই এর ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি। বস্তুত কারো অনুকরণ নয়, সভ্যতাগত কার্যকারণ মেনেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। 

খালদুন যেমন বলেছেন, যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে, তাহলে মানুষ তার পানাহার-বাসস্থানের প্রয়োজন পূর্ণ করা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তার এই প্রয়োজন পূর্ণ হলেই সে জ্ঞান-বিজ্ঞান-শাস্ত্রের মতো অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে মনোনিবেশ করতে পারে। মানুষ তার চিন্তা-বিবেচনার মাধ্যমে পশুদের থেকে পৃথক ও বিশিষ্টপূর্ণ হয়। পানাহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা না হলে সে তার মানবিক গুণাবলী বিকাশ করতে পারে না, জৈবিক ও মানবীয় প্রয়োজনেই অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে বাধ্য হয়। (আল মুকাদ্দিমা, পৃ. ৪৪১ )  

The post মুসলিম বোঝাপড়ায় চিকিৎসাবিদ্যা   appeared first on Fateh24.



from Fateh24 https://ift.tt/2x9XGkQ

No comments:

Post a Comment