Sunday, April 26, 2020

ধর্ম ও বিজ্ঞান : প্রেক্ষিত করোনা মহামারি  

আশরাফ উদ্দীন খান

বৈশ্বিক করোনা মহামারীর প্রভাব বা ফলাফলের একটি বহুমাত্রিক রূপ অনুমান করা যাচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে নিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সেই সাথে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়বে, এবং সেটা হবে শুধু আঞ্চলিক নয় বরং বৈশ্বিক –এমন একটি আলামত দেখা যাচ্ছে।  

করোনা মহামারীকে কেন্দ্রকরে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাঝে এবং সেখান থেকে ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’য়  বিভেদের দেয়াল উঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে মহল বিশেষের পক্ষ থেকে। এই প্রবণতার সূচনাতে আন্তঃধর্মীয় বিরোধ অনেকটা শক্তিশালী ছিল। সূচনাটা শ্রেণী পর্যায়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকে এখন বিশ্বব্যাপী রুপ নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। 

প্রথমে এক ধর্মের লোকেরা প্রতিবাদের ভাষায় বলতে লাগলেন দেখেন অমুক ধর্মের লোকেরা এই করছে, অমুক সংগঠনের অনুসারীরা এই করছে, আবার হিন্দুরা তাবলীগ, মারকাজের লোকদের বিরুদ্ধে আপত্তির তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। কেউ একজন মন্তব্য করে বসল ‘ভারতের সমস্যা দুটি। এক, করোনাভাইরাস ; দুই, তাবলীগ’। 

মুসলিম উম্মার গণজমায়েত সাধারণ ও প্রতিদিনের বিষয়। প্রতিদিন পাঁচবার মুসলমানদেরকে একত্রিত হতেই হয়, মসজিদে নামাজের উদ্দেশ্যে। নামাজের বাইরে রয়েছে উমরাহ ও হজ্জের বিষয়। হজের বিষয়টি বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে হয়ে থাকে, এবং এখন সেই সময় উপস্থিত না হওয়ার কারণে বিষয়টি তেমন সমস্যার রুপে প্রকাশ পায়নি, তবে ধীরে ধীরে সেই সময় এগিয়ে আসছে, ফলে এখানে একটা আতংকের সৃষ্টি হচ্ছে। উমরার বিষয়টি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলেই সেটা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে –দোয়া করি অচিরেই এই অবস্থা দূর হয়ে যাক-। 

মুসলমানদের কাছে দ্বীনের মর্যাদা-স্থান নিজেদের জীবনের চেয়েও অনেক বেশী। আর নামাজ, জামাত, মসজিদ, হজ্জ, উমরা এই সকল বিষয় মুসলমানদের জীবনে কি গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে যেটা বুঝার জন্য খুব বেশী গবেষণার দরকার নেই। আমাদের মধ্যে যারা এই করোনা-পরিস্থিতি এবং এই ব্যপারে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ পর্বেক্ষন করছিলেন, তাদের কাছে এটা আশ্চর্যের বিষয় বলেই মনে হবে যে, ধর্মীয় ইবাদত ও বিষয়ে বাধ্যবাধকতার ব্যাপারটি মুসলিম উম্মাহ এত সহজে মেনে নিবেন ও গ্রহণ করবেন, এবং নিজেদের সেই উদ্ভুত অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন –সেটা আমরা ধারণা করতে পারিনি। মানসিকভাবে দুঃখিত হলেও, পরিস্থিতির কারণে সেটা মুসলিম উম্মাহ মেনে নিয়েছেন এবং এর চেয়েও সুন্দর কোন ব্যবস্থা হতে পারে কিনা বা করা যায় কিনা তার জন্যে তাদের চিন্তা ও ফিকির জারি আছে। 

এই বিষয়টি থেকে আমাদের কাছে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে তাত্ত্বিকভাবে ইসলাম আর বিজ্ঞানের মাঝে যেমন কোন সংঘাত নেই, তেমনি ব্যবহারিকভাবেও এটা নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম ও বিজ্ঞানের মাঝে কোন বিভাজনের রেখা দাঁড় করানো যায়নি। এই মহামারীকে কেন্দ্র করে, বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞান যে ব্যাখ্যা দিয়েছে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উদ্দেশ্য, ইসলামী মূলনীতি ও দর্শনে সেটাকে অস্বীকার করা হয়নি। বরং বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে ইসলাম তাঁর নিজস্ব দর্শন, উসুল, মূলনীতি দিয়ে তাঁর অনুসারীদেরকে বুঝিয়েছে। একটি ধর্ম কি পরিমাণ বিশাল হতে পারলে এই ভাবে এত সহজে এই ধরণের পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডকে নিজের দর্শনে হজম করে নিজস্ব ভাষায় পেশ করতে পারে, তার উদাহরণ একমাত্র ইসলামই হতে পারে। 

বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি-প্রবাহ অনুসরণ ও পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় যে, ধর্মীয় আচরণ বা ধর্মের ছায়ায় যে সকল আচরণ ও ঘটনা ঘটছে সেগুলোকে একত্রিত করে ধর্মকে বিজ্ঞানের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে একটা রায় দেওয়ার চেষ্ঠা বা চিন্তা চলছে। সেই রায়ের খোলাসা এমন হতে পারে ‘ধর্ম, ধার্মিকতা, ধর্মীয় প্রবণতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আধুনিক বিশ্বের উন্নতি ও নিরাপত্তার পথে…………’। 

দিল্লীর নিজামুদ্দিন, মালয়েশিয়ার তাবলীগ জামাত, আমাদের দেশের জানাযার নামাজের জামাত ইত্যাদি ঘটনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে যে পরিমাণ স্থান, সময় ও গুরুত্বদিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হচ্ছে –সেটা এই ধরণের একটা উপসংহারের দিকেই নিয়ে যায়। 

মুসলমানদের সাথে সম্পর্কিত যে সকল উদাহরণ উপরে টানলাম সেগুলো এই পরিস্থিতির জন্যে কল্যাণকর ছিল না –এতটুকু সত্য বা বাস্তব। পরিস্থিতির বিচারে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এসকল আচরণ সমর্থন পায় না। এখানে আমরা এই সকল আচরণের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করছি না, আলোচনা করছি ধর্মকে যেভাবে এখানে উপস্থাপন করার চেষ্ঠা করা হচ্ছে সেটা নিয়ে। 

নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই ধরণের মহামারী সৃষ্টি ও মহামারি ছড়িয়ে দিতে ধর্মের অবস্থান যদি ইনসাফের সাথে বিবেচনা করা যায় তাহলে আমরা কি দেখতে পাবো? এই ভাইরাস কি কোন মসজিদ বা ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে চড়িয়েছে? ধর্মীয় কোন আচরণ বা কাজের মাধ্যমে এটি সৃষ্টি হয়েছে? ধর্মের সাথে সম্পর্কিত যে কয়টি উদাহরণ পেশ করেছি সেই কয়টি উদাহরণ বৈশ্বিক সামাজিক মেলামেশার মধ্যে তাদের অবস্থান কতটুকু? 

গত ১০০ বছরের মধ্যে দুনিয়া যে সকল মহামারি, দুর্ভিক্ষ, মহামন্দা, বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে এই সকল পরিস্থিতির জন্যে সুদ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অমানবিক অর্থবণ্টন ব্যবস্থা, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা, সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক স্পৃহা, সামাজিক ও রাজনৈতিক অত্যাচার, নিজেদের জাগতিক উন্নতির জন্যে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে নির্মমভাবে ব্যবহার করা, অনৈতিক-অসামাজিক ও অবৈধ মেলামেশা, অনিরাপদ-অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি নানাবিষয় এখানে মৌলিকভাবে দায়ী। চিন্তা করে দেখুন এই সমস্ত বিষয়ের ব্যাপারে ইসলাম ধর্ম কিভাবে মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে? ইসলামী বিধি-বিধান পালান না করার কারণেই এই ধরণের বৈশ্বিক মহামারি ও দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে –এটাই প্রকৃত বাস্তবতা। 

কিন্তু এই দুনিয়ার আরেক বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, এখানে ধর্মকে অভিযুক্ত করা যায় অতি সহজে। সেই সহজ পথেই অনেকে অগ্রসর হতে চাচ্ছেন। ইসলামকে ধর্মকে নিশানা বানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ফায়েদা উঠাতে চিন্তা ও চেষ্ঠা করছেন। 

আন্তর্জাতিক লেখিকা ‘অরুন্ধতী রায়’ তাঁর একটি কলাম ‘এই মহামারী নতুন দুনিয়ার ঢোকার পথ’ এ লেখেছিলেনঃ “…টানা দুই সপ্তাহ ধরে লকডাউন চলছে। সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসেরও সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চলছে রাজনৈতিক সংকট। মূলধারার মিডিয়া, কোভিডের গল্পটিকে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। লকডাউন ঘোষণার আগে দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের একটি সমাবেশ হয়েছিল। এটি এখন এই ভাইরাসের সুপার স্প্রেডার হিসেবে পরিণত হয়েছে। মুসলিমদের আঘাতের জন্য এখন এটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টা অনেকটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে ভাইরাসটি মুসলমানরা আবিষ্কার করেছে এবং এটি ইচ্ছাকৃতভাবে জিহাদের মতো করে তারা ছড়িয়ে দিয়েছে” (০৮ এপ্রিল, প্রথম আলো) 

ধর্মকে অভিযুক্ত না করে, স্বীকার করা উচিত যে, ধর্মের অনুসরণের মধ্যেই বিশ্ব নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে। ধর্ম ও বিজ্ঞানকে একসাথে গ্রহণ করেই পৃথিবী উন্নত ও নিরাপদ থাকতে পারে। 

The post ধর্ম ও বিজ্ঞান : প্রেক্ষিত করোনা মহামারি   appeared first on Fateh24.



from Fateh24 https://ift.tt/2xaesjJ

No comments:

Post a Comment